মহাকাল চলেছে তার নিজস্ব পথ ধরে কখনো সে ক্লান্ত হয়ে থেমে থাকে না। চলাই তার ধর্ম।
আমরা বঙ্গবাসীরা নিজেদের বৈদিক মুনি ঋষিদের বংশধর বলে গৌরব বোধ করি। এমনি কয়েকজন ঋষি ছিলেন যাদের বংশধর বলে আজও আমরা নিজেদের বংশ পরিচয় দিই, আমাদের গোত্র চলে আসছে তাদেরই নামে। বংশ পরিচয় দিতে গেলে বলতে হয় সৌকালীন গোত্র, ঘোষ বংশ।
আমাদের আদি নিবাস ঢাকা জেলার বিক্রমপুর সাবডিভিশনের পারুলদিয়া গ্রামে। শুরু করি স্বর্গীয় মকরন্দ ঘোষ থেকে আমাদের বংশতালিকায় তিনি সর্বাগ্রে স্থান পেয়েছেন। পূর্বপুরুষের আশীর্বাদ প্রার্থনা করে আজো আমি প্রতিদিন ভোরে সূর্য প্রণামের পর পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে জল তর্পণ করি। কোনদিন ভুল হয় না। আমি ঈশ্বর গোবিন্দ চন্দ্র ঘোষের কনিষ্ঠ পুত্র পূজনীয় নিশিকান্ত ঘোষ ও পূজনীয়া সুনীতি দেবীর চতুর্থ পুত্রবধূ। আমার বিয়ে হয়েছিল ১৯৫৯ সনে দোসরা জুন ১৮ই জ্যৈষ্ঠ মঙ্গলবার। আমার স্বামীর নাম অসীম কুমার ঘোষ। আমি যখন এ বাড়িতে পুত্রবধু হয়ে আসলাম তখন তারা প্রতিষ্ঠিত ছিলেন তৎকালীন পশ্চিম দিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জ শহরে, বাড়ির নাম "বড়বাসা" সামনের রাস্তার নাম "উকিলপাড়া"।
পূর্ববঙ্গ থেকে আমার দাদা শ্বশুর স্বর্গীয় গোবিন্দচন্দ্র ঘোষ ভাগ্যান্বেষণে রায়গঞ্জে এসে প্রতিষ্ঠিত হন। তিনি আইনজীবী ছিলেন। ১৬ বিঘা জমির উপর বসত বাটি তৈরি করেছিলেন সে কত যুগ আগের কথা। বাড়ির সামনে ছিল বিশাল প্রাঙ্গণ পরপর তিন আঙ্গিনায় ছিল অন্দরমহল, পূর্ব দিকে বেলতলায় ছিলেন স-পারিষদ কষ্টি পাথরের প্রাণ জুড়ানো বাসুদেবের জ্যোতির্ময় মূর্তি। বাড়ির পেছনে ছিল বিভিন্ন রূপে বিভিন্ন স্বাদের আমবাগান, কাঁঠাল, গোলাপজাম, কুল, চালতা কি ছিল না? আর ছিল ধান ভর্তি গোলাঘর, ঢেঁকিঘর ও গোয়াল ঘরে গরু। আমার বিয়ের সময় আমগাছে অজস্র আম ঝুলছে, কাঁঠাল গাছে কাঁঠাল আর লাল হয়ে আছে ফলবতি লিচু গাছ। দুটো লিচু গাছে বিশাল মৌচাক, এখানে এদের বংশানুক্রমিক ভাবে চাক বাঁধার অধিকার। প্রতিবছর কোথা থেকে উড়ে এসে একই জায়গায় নিপুণভাবে নিজের গৃহ তৈরি করে মধুচক্র। আমি দোতলা থেকে তাকিয়ে আছি, মাঝে মাঝেই মৌমাছিদের ডানার দোলায় কি যে এক ছন্দ সৃষ্টি করত আমার সর্ব দেহের শিরায় শিরায় শিহরণ জেগে উঠতো। বাড়ির সামনের প্রাঙ্গণে দুর্গাপূজা হত সেখানে কুমোরেরা এসে থাকতো সারা বছরই কোন না কোন ঠাকুর তৈরি হতো আর তাদের ঘিরে থাকতো বাচ্চাদের ভিড়। দূর্গা পূজার ষষ্ঠীর দিন বোধন অধিবাস দিয়ে হতো পুজোর শুরু ।
বাসুদেব তলার বেলতলায় সেই বোধন অনুষ্ঠিত হতো। মায়ের ভোগ রান্না হতো বাড়ির ভিতর। এখনো সেই নিয়ম চলে আসছে। বাড়ির একদম সামনে এখন পাড়ার কিছু উদ্যোগী পুরুষ দুর্গা মন্দির তৈরি করেছে সেখানে মা দুর্গার নিত্য পূজা হয় অন্ন ভোগ দিয়ে।
বিয়ের পর যেমন দেখেছি-
আমারে বাড়িতে বউ হয়ে প্রথম গৃহপ্রবেশের দিনের কথা আজও স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে।
বিকালের ট্রেনে আমরা রায়গঞ্জে পৌঁছেছিলাম বরযাত্রী সমাবৃত হয়ে গাড়ি থামতেই দেখলাম জানালা দিয়ে অনেকগুলি
উৎসুক মুখ, বাড়ি থেকে এসেছে বউ নিয়ে যেতে। ঠিক সন্ধ্যার সময় খোলা গাড়িতে ছেলে বউকে বসিয়ে সামনে বাজনাদাররা
বাজনা বাজাতে বাজাতে নিয়ে চলল বাড়ির দিকে। মাথা নিচু করে বসে আছি কারণ পথে উৎসুক মুখের ভিড় বেশ বুঝতে পারছি।
নিখিল রঞ্জন এর উদ্যোগে বাড়ির সামনে ছেলেদের নিজেদের হাতে তোরণ তৈরি হয়েছে। গাড়ি থেকে নামিয়ে বহিঃবাড়ির
কাছারি ঘরে পরলোকগত পিতৃপুরুষের আলোকচিত্রের সামনে দাঁড় করানো হলো, মাথা নিচু করে দুই হাত জোড় করে তাদের
আশীর্বাদ প্রার্থনা করলাম। স্বর্গীয় গোবিন্দচন্দ্র ঘোষ ,কুলদা কান্ত ঘোষ ও নিশিকান্ত ঘোষ সেদিন সবাই আমাদের
আশীর্বাদ করে আমাদের জীবনকে ধন্য করেছিলেন।
এবার চললাম অন্দরমহলে। উঠোনে কালো পাথরে দুধে আলতায় পা ডুবিয়ে দুজনকে দুটো বড় পিঁড়িতে বসানো হলো। এখানে বধূবরণ এর ব্যবস্থা। কানে মধু আর মুখে মিষ্টি দেওয়ার রীতি টা বেশ ভালো ভাবেই বুঝতে পারলাম। এবার গৃহের অন্দরে প্রবেশ। বাড়ি ভর্তি নিজেদের আপনজন। দার্জিলিং থেকে এসেছেন সব ভাসুরেরা, সপরিবারে বাড়ির বিবাহিত মেয়েরাও এসেছেন, ননদ ভাসুরঝি এমনকি পিসতুতো ভাসুরঝিও এসেছিলেন। দাদা শ্বশুরের পাঁচ ছেলের চোদ্দ ভাইয়ের মধ্যে উনি ত্রয়োদশ । আমার বিয়ের সময় আমার জ্যাঠাশ্বশুর যামিনী কান্ত ও বড় পিসিশাশুড়ি জ্ঞানদা সুন্দরী দেবী জীবিত ছিলেন। পিসিমার বাড়ি আর আমাদের বাড়ি ছিল ঠিক রাস্তার দু'ধারে মুখোমুখি "গুহ বাড়ি"। আমাদের বিয়ের সময় বাড়ি ভর্তি লোক দিদি ও দাদাবাবু, (অমলাদি ও নির্মল কুমার )সোনাদা ও সোনাদি (অশোক কুমার ও নীলিমাদি) ভাসুর ঠাকুর অমল কুমার ও গার্গীদি, সস্ত্রীক নিখিল রঞ্জন ,সপরিবারে মণি দি, দার্জিলিং থেকে এসেছেন মেজদি ও ভাসুর ঠাকুর (কল্যাণী দি ও জ্যোৎস্না কুমার ) অজিত কুমার ও রেনুদি (দাদা ও দিদিমণি), ভাসুর ঠাকুর অনিল কুমার ও বন্দনা, টিটাগর থেকে সেজদা ও সেজদি অসিত কুমার ও রেবাদি, কলকাতা থেকে সপরিবারে হাসিদি ও নন্দাই শ্যামাপদ বাবু, কুচবিহার থেকে দুই ননদকে নিয়ে ছায়া ভাসুরঝি, সপরিবারে জলপাইগুড়ি থেকে আলো ভাসুরঝি,গুহ বাড়ির শোভা ভাসুরঝি, কুচবিহার থেকে খুড়িমার মেয়ে খুকি দি আরো কত লোক,গীতা ভাসুর ঝি ও তার বাবা মুক্তেশ চন্দ্র এসেছিলেন। মুক্তেশ চন্দ্র ছিলেন আমার বিয়ের বরকর্তা।
বিয়ে উপলক্ষে খাওয়া-দাওয়া হইচই ছাড়াও আনন্দ অনুষ্ঠান ও করেছে মেয়েরা, রেবাদি ও খুকিদি সেখানে গান গেয়েছিলেন বেশ মনে আছে। তার আগেই ফাল্গুন মাসে গুনু ভাসুরপোর বিয়ে হয়েছিল, শেফালী ও এসেছিল। সবাই মিলে খোলা আকাশের নিচে স্টেজ হয়েছিল আমাদের বারান্দায় তারপর দিন সিনেমা দেখা নার্গিসের "মাদার ইন্ডিয়া" আমার একমাত্র দেওর খোকা দা (অঞ্চল) ছিলেন অনুষ্ঠানের কর্মকর্তা। আমি বিয়ের কথা লিখলাম এই জন্য তখনকার দিনে আমাদের বাড়ির ঐতিহ্যটা সবাই জানতে পারবে। আমার লেখার মধ্যে শুধু আনন্দের খবরই থাকলো দুঃখের কথাগুলি নিজের মধ্যেই জমা রইল। সুখ ভাগ করে উপভোগ করা যায় কিন্তু দুঃখ ভাগ করা যায় না একথা আমার নয় স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখে গেছেন।
গুহ বাড়ির পাশেই আরেক পিসি শাশুড়ি সরোজিনী দেবীর বাড়ি "মিত্রালয়"। এই পিসিমা অল্প বয়সে মারা যান, মারা যাওয়ার পরে পিসেমশাই যাকে বিয়ে করে আনেন তাকে আমার দিদি শাশুড়ি নিজের মেয়ে বলে গ্রহণ করেন। সেই পিসিমা প্রতিবছর জ্যাঠামশাই যামিনী কান্তকে ভাইফোঁটা দিতেন, ঠাকুমাকে মায়ের মত শ্রদ্ধা করতেন। মধুর সম্পর্ক ছিল এই পরিবারের সাথে। আরেক পিসিমা গিরিবালা দেবী ছিলেন বাল বিধবা তার একমাত্র শিশু পুত্র সন্তান ও স্বামীকে হারানোর পর তাকে তার বাবার বাড়ি রায়গঞ্জের নিয়ে আসা হয়। অত্যন্ত নিষ্ঠাবতী ছিলেন তিনি। সত্যিকারের শিল্পী তার হাতে গড়া একটি মাটির শঙ্খ চুন লেপে সাদা করা আমি অযত্নে পড়ে থাকতে দেখেছি ,তার হাতে তৈরি অপূর্ব সুন্দর বড় কাঁথা ধ্রুবকে তিনি দিয়েছিলেন। বাড়ি ছেড়ে সবাই চলে যাওয়ার অনেক পরে অবহেলায় পড়ে থাকা একটি কালো পাথরের থালা আমি পেয়েছি এটার চারধারে কাঁধা ভাঙ্গা হয়েছে। পাথরের থালায় পিসিমা নরুণ দিয়ে কুরে কুরে সুন্দর ফুল তৈরি করেছিলেন। তখন অনেক আমগাছ আম দিয়ে আচার, আমসত্ত্ব দেওয়া হতো। এটা পিসিমার আমসত্ত্বের ছাঁচ হিসাবে ব্যবহার করতেন। পিসিমাকে সবাই গোপাল পিসিমা বলে ডাকতো কারণ তার কাছে ছোট্ট একটা পিতলের গোপালই ছিল একমাত্র ঈশ্বর। সেই গোপাল দিদির (অমলাদি) কাছে রাখা ছিল। আমি ছোট ছোট মেয়েদের নিয়ে শ্রীকৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম বলতাম বলে খুশি হয়ে দিদি আমাকে সেই বাল- গোপাল দিয়েছিলেন। তিনি আমার গৃহে প্রতিষ্ঠিত আছেন। মা আমাকে বাবার স্মৃতি হিসেবে একটা পাথরের গোলাঘর আর একটা চায়ের প্লেট দিয়েছিলেন যত্নে রাখা আছে। মুক্তাক্ষরে লেখা মার কয়েকটি চিঠি আমার কাছে সযত্নে রক্ষিত আছে।
গোবিন্দ ঘোষের স্ত্রী ছিলেন নিত্য মনি দেবী, নয়টি সন্তান নিয়ে তার সুখের সংসার চারটি পুত্র ও পাঁচটি কন্যার জনক জননী ছিলেন তারা। সেই যুগে প্রতিটি পুত্র সন্তানকে কিভাবে এত কৃতি তৈরি করলেন সে এক বিস্ময়ের বিষয়। বড়দাকান্ত ছিলেন ডাক্তার। ক্যাম্পবেল মেডিকেল স্কুল কলকাতা থেকে পাস করেন, পরবর্তীকালে এই স্কুলের নাম হয় নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ, মেজো ছেলে কুলদাকান্ত ছিলেন রায়গঞ্জ কোর্টের উকিল, সেজো ছেলে যামিনী কান্ত ছিলেন ডাক্তার গাইনোকোলজিস্ট, বোম্বাই থেকে ডাক্তারি পাস করেন। ছোট ছেলে নিশিকান্ত বাবার বিপুল সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ করতেন। তিনিই ছিলেন রায়গঞ্জ বয়েজ স্কুলের শিক্ষক ।ওই স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষকের সাথে একবার আমার স্বামী মা ও আমাকে নিয়ে লেকটাউনের বাড়িতে দেখা করতে গিয়েছিলেন। তার মুখে শুনেছিলাম ওই স্কুল গড়ে তোলার কাজে তার অক্লান্ত পরিশ্রম ও সহযোগিতার কথা। ১৯১১ সালে রাজা পঞ্চম জর্জের করোনেশন বা রাজ্যাভিষেকের সম্মানে স্কুলের নাম হয় করোনেশন স্কুল।
প্রতিটি কন্যাকেও তিনি উপযুক্ত শিক্ষিত পাত্রের কাছে পাত্রস্থ করে গেছেন। শিক্ষার উপর তার এত আগ্রহ ছিল বলেই রায়গঞ্জ কলেজের জন্য বিশাল জমি দান করে গেছেন। আমার বৌভাতের পরদিন বিকেলে স্লোগান দিতে দিতে হই হই করে একদল জার্সি পরা ছেলে এসে বাড়িতে ঢুকলো, হাতে তাদের শিল্ড। ফুটবল ম্যাচ জিতে এসেছে, কলকাতা থেকে আসা দল কে হারিয়ে শিল্ড দখলের উল্লাসে মেতে উঠেছে। উঠানের মাঝখানে চেয়ার পেতে শিল্ডটি রাখা হলো। শিল্ড টি আমার জ্যাঠা শ্বশুর কুলদাকান্তের নামে, বাড়ি থেকে দেওয়া হয়েছিল ।এই শিল্ড এখনো খবরের কাগজে স্থান পায়। ছেলেরা মিষ্টিমুখ করে আনন্দ করতে করতে চলে গেল।
আমার দিদি শাশুড়ি স্বর্গীয়া নিত্যমনি দেবীর অতিথি সেবার কথা উল্লেখযোগ্য। প্রতিদিন দুপুরে ভাত খাওয়ার আগে অপেক্ষা করে থাকতেন ।স্টেশনে লোক যেত কোন অপরিচিত নতুন অতিথি আসলে তাদের ডেকে এনে খাওয়াতেন, তারপরে তিনি নিজে ভাত খেতেন। তার বাবার বাড়ির পরিবারও আমাদের বাড়ির সংলগ্ন জায়গায় থাকতেন। এখনো আছেন খুড়ীশাশুড়ি র (চপলা দেবীর) স্নেহ আশীর্বাদ আমি পেয়েছি। নানা রকম পূজা পার্বণ তার বাড়িতে হতো। আমরা প্রসাদ পেতাম। রোজ সকালে তিনি আসতেন বাসুদেব তলায় প্রণাম করতে। এই বাসুদেব কে? জ্যাঠামশাই যামিনী কান্ত এক জমিদার বাড়ির চিকিৎসক ছিলেন কোনো কারণে একদিন ওই বাড়িতে তার ডাক পড়ে সেই সময় ওই বাড়িতে একটি পুকুর কাটা হচ্ছিল মাটি কাটার সময় ভাঙ্গা ভাঙ্গা অনেক মূর্তি উড়ছিল। জমিদার বাবু বললেন যতক্ষণ ডাক্তার বাবু উপস্থিত আছেন তার মধ্যে সবচেয়ে ভালো মূর্তিটা তাকে দেওয়া হবে। ওই সময় বাসুদেবের মূর্তি ওঠে ,তাকে রায়গঞ্জে নিয়ে আসেন এবং বেলতলায় প্রতিষ্ঠিত করেন। সময় সময় বাড়ির সকলে মিলে এখানে হরিলুট দেওয়া হত বাতাসা দিয়ে। রাণী দি (অরুনিমা) বিএ পাস করার পর জ্যাঠামশাই অমৃতি মিষ্টি দিয়ে লুট দিয়েছিলেন। রানীদি গাইলো "লুট পরলো লুটের বাহার লুটে নেড়ে তোরা পোলাপানে হাত বাড়াইলো ঠকলো যত বুড়া"।।
কিন্তু কি কারনে জানিনা এই বাসুদেব মূর্তি কোন গৃহ মধ্যে রাখা হয়নি আমাদের বাড়ির কোন বাউন্ডারি ওয়াল ছিল না উন্মুক্ত স্থান। আমার বিয়ের ১০-১২ বছর পরে কোন দুর্বৃত্ত সেটা চুরি করে নিয়ে গেল শত চেষ্টা করেও তা জানা গেল না অথবা বাসুদেব নিজেই স্থান পরিবর্তন করেছেন। আমার মার পাঁচ ছেলে তিন মেয়েকে আমি দেখেছি তার মুখে শোনা কথা থেকেই আমি সব লিখছি। বনলতা তার বড় মেয়ে ছিলেন (খুদি দি) বিয়ের পর অল্প বয়সে মৃত্যু হয়। সেই জামাই ও অল্প আয়ু নিয়ে এসেছিলেন। বড় ছেলে ছিল চন্দন অপূর্ব রূপবান । দুই আড়াই বছরের সেই ছেলে মায়ের কোল খালি করে চলে গেল। বাড়িতে ছিল চারিদিক গোল করা বাঁধানো বড় ইদাঁড়া তার জলে স্নান খাওয়া সবকিছু হতো। এর মধ্যে আমাদের নতুন দালান বাড়ি তৈরি হয়েছে। গৃহপ্রবেশের দিন মাতৃ আদেশে সকালবেলায় নারায়ণ পূজার সময় বড় পিসিমাকে আনতে গেলাম পিসিমা এসে আনন্দে চোখের জলে বার করে বলছেন নৈশা নৈশা ......(নিশিকান্ত)। ছোট ভাইয়ের কথায় তার মনে যেন আবেগ উথলে উঠছে। বাড়ির সামনে দুটো ছোট ছোট খেজুর জাতীয় গাছ ছিল মাঝখানে বাড়িতে ঢোকার একটা রাস্তা। একটি লাল সিল্কের ফিতে বেঁধে বাড়ির ছেলেমেয়েরা দাদু যামিনী কান্তের হাতে একটা কাচি ধরিয়ে দিল, শঙ্খ বাজালাম, জ্যাঠামশাই ফিতে কেটে গৃহপ্রবেশ করলেন।
আমার কাছে একটা ছবি ছিল হয়তো খুঁজলে এখনো পাওয়া যাবে। তাতে মা কুলো হাতে, রাণীদির কোলে তোতন, আর আমি ও মুন্না ওই ছবিতে আছি। উনি বাড়ির চারদিক প্রদক্ষিণ করছেন, পূজো হচ্ছে, আলপনা দেওয়া বারান্দায় বাবলি বসে আছে। রাত্রে স্থানীয় কিছু নিমন্ত্রিত লোক ও বাড়ির লোকেদের প্রীতিভোজ হয়েছিল। আমিও রাণীদি মিলে মস্ত হাড়িতে মাংস রান্না করেছিলাম। মিষ্টির দোকান থেকে অর্ডার দিয়ে লুচি মিষ্টি আনা হয়েছিল।
এ পৃথিবীর সব জিনিস ক্ষণস্থায়ী যতই আমরা সবকিছুই আমাদের আমাদের করি একমাত্র ঈশ্বরই নিত্য সত্য, সেই ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা পরবর্তী প্রজন্ম যেন তাদের সত্যনিষ্ঠা দিয়ে পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য রক্ষা করতে পারে। "ঔজো নিত্যঃ শাশ্বতহয়ং পুরানো ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে।